গাছের পৃথিবী ছোট হইলে মানুষের পৃথিবীও ছোট হয়

আপলোড সময় : ০২-০৬-২০২৬ ০৭:৩৯:০৮ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ০২-০৬-২০২৬ ০৭:৪২:৫৪ পূর্বাহ্ন
মানুষ প্রায়ই মনে করে, পৃথিবীর ইতিহাসে সে-ই প্রধান চরিত্র। সভ্যতা, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি—সকলকিছুর কেন্দ্র যেন মানুষ নিজেই। কিন্তু প্রকৃতির দৃষ্টিতে এই ধারণা সম্পূর্ণ সত্য নহে।

কারণ, মানুষের বহু পূর্বে এই পৃথিবী ছিল বৃক্ষের, শৈবালের, ঘাসের, লতাগুল্মের। মানুষ এখনো যাহা কিছু ভোগ করে অন্ন, বস্ত্র, ওষুধ, অক্সিজেন, আশ্রয়, এমনকি শিল্পোন্নয়নের বহু কাঁচামাল—সকল কিছুর ভিত্তিতেই কোনো না কোনোভাবে উদ্ভিদজগতের অবদান রহিয়াছে।

সেই উদ্ভিদজগৎ‍ই যদি সংকুচিত হইতে থাকে, তবে মানবসভ্যতার ভিত্তিও ধীরে ধীরে দুর্বল হইয়া পড়িবে। সম্প্রতি বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত এক গবেষণা বিশ্ববাসীর জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা বহন করিয়া আনিয়াছে।

গবেষণায় ৬৭ হাজারেরও অধিক উদ্ভিদ প্রজাতি বিশ্লেষণ করিয়া দেখা গিয়াছে যে, চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ ৭ হইতে ১৬ শতাংশ উদ্ভিদ প্রজাতি তাহাদের বর্তমান আবাসস্থলের ৯০ শতাংশেরও অধিক হারাইতে পারে। ফলত, বহু প্ৰজাতি বিলুপ্তির উচ্চঝুঁকিতে পড়িবে।

আমরা প্রায়ই জলবায়ু পরিবর্তনকে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সমস্যা বলিয়া বিবেচনা করি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে জলবায়ু পরিবর্তন একটি জটিল বাস্তবতা, যাহা বৃষ্টি, মাটির গুণাগুণ, আর্দ্রতা, ছায়া, অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি এবং সমগ্র বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যকে প্রভাবিত করে।

একটি উদ্ভিদ কেবল মাটির উপর দাঁড়াইয়া থাকে না, তাহার অস্তিত্ব নির্ভর করে বহু সূক্ষ্ম পরিবেশগত শর্তের সমন্বয়ের উপর। সেই সমন্বয় ভাঙিয়া গেলে উদ্ভিদের জন্য পৃথিবী ক্রমেই ছোট হইয়া আসে। মানুষের মতো উদ্ভিদ স্থান পরিবর্তন করিতে পারে না।

তাহাদের বিস্তার ঘটে অত্যন্ত ধীরগতিতে—বাতাস, পানি, প্ৰাণী কিংবা অভিকর্ষ বলের সাহায্যে বীজ ও রেণুর মাধ্যমে। এক প্রজন্ম হইতে আরেক প্রজন্মে যাইতে যাইতে বহু সময় অতিবাহিত হয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের গতি এত দ্রুত যে বহু উদ্ভিদ সেই পরিবর্তনের সহিত তাল মিলাইতে পারিতেছে না।

ফলে নতুন কোনো অঞ্চলে পৌঁছাইবার আগেই তাহারা অস্তিত্বসংকটে পতিত হইতেছে। এই সংকটের আর-একটি ভয়াবহ দিক রহিয়াছে। উদ্ভিদ কেবল প্রকৃতির অলংকার নহে, স্থলভাগের অধিকাংশ বাস্তুতন্ত্রের ভিত্তি।

বনভূমি ও উদ্ভিদরাজি বায়ুমণ্ডল হইতে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে। মাটি রক্ষা করে, বন্যপ্রাণীর আবাস গড়িয়া তোলে, খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ করে। সুতরাং উদ্ভিদের সংখ্যা ও বৈচিত্র্য কমিয়া গেলে প্রকৃতির স্বাভাবিক কার্বনচক্রও ক্ষতিগ্রস্ত হইবে।

ফলে, বৈশ্বিক উষ্ণতা আরো বৃদ্ধি পাইবে। অর্থাৎ এক ভয়ংকর প্রতিক্রিয়ামূলক চক্রের সৃষ্টি হইবে—জলবায়ু পরিবর্তন উদ্ভিদের ক্ষতি করিবে, আবার উদ্ভিদের ক্ষতি জলবায়ু পরিবর্তনকে আরো ত্বরান্বিত করিবে। বাংলাদেশের জন্য এই গবেষণা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। আমাদের দেশ এমনিতেই জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল।

নদীভাঙন, লবণাক্ততা, খরা, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ও তাপপ্রবাহের প্রভাব ইতিমধ্যে দৃশ্যমান। যদি উদ্ভিদ ও বনজ সম্পদের উপর এই চাপ আরো বৃদ্ধি পায়, তবে কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং খাদ্যনিরাপত্তা—সকলই নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হইবে।

বিশেষত সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্রের ভবিষ্যৎ লইয়া উদ্বেগ আরো বাড়িবে। অবশ্য গবেষণায় ইহাও বলা হইয়াছে যে পৃথিবীর কিছু অঞ্চলে স্থানীয় উদ্ভিদ-বৈচিত্র্য বাড়িতে পারে। নূতন পরিবেশে কিছু প্রজাতি বিস্তার লাভ করিবে। কিন্তু এই আংশিক লাভ সামগ্রিক ক্ষতিকে পূরণ করিতে পারিবে না।

কারণ, নূতন উদ্ভিদসমাজের সৃষ্টি মানেই পুরাতন ভারসাম্যের অবসান। ইতিহাসে যাহারা কখনো একত্রে বাস করে নাই, তাহারা একত্রে বাস করিলে তাহার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হইবে, তাহা এখনো অজানা। সভ্যতার ইতিহাসে মানুষ বহুবার প্রকৃতিকে জয় করিবার কথা বলিয়াছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হইল, মানুষ প্রকৃতির অংশমাত্র।

গাছপালা, বনভূমি ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করিয়া মানুষ কখনো নিজের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করিতে পারে না। গাছের পৃথিবী সংকুচিত হওয়া মানে মানুষের নিরাপত্তার পরিধিও সংকুচিত হওয়া। অতএব, উদ্ভিদ-বৈচিত্র্য রক্ষা কেবল পরিবেশবাদীদের আবেগের বিষয় নহে, , ইহা মানবসভ্যতার অস্তিত্বরক্ষার প্রশ্ন।

পিকে/এসপি

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদক : মোঃ মাকসুদেল হোসেন খান

সম্পাদক : মো. শরীফুল ইসলাম (শরীফ প্রধান)

যোগাযোগ : 01675785122

ই-মেইল : prodhankhabor@gmail.com

অফিস :

ঢাকা অফিস : হাউজ#৬, রোড#০৩, ব্লক#জে, বারিধারা ঢাকা-১২২৯।

কুমিল্লা অফিস : কদমতলী সুপার মার্কেট (ভূমি অফিস সংলগ্ন), বলদাখাল রোড, দাউদকান্দি পৌর বাজার, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।

ওয়েবসাইট : www.prodhankhabor.com